হাইড্রার চলন (Locomotion in Hydra)

হাইড্রার চলন(Locomotion in Hydra)

খাদ্যন্বেষণ, আত্মরক্ষা, প্রজনন ইত্যাদি জৈবিক প্রয়ােজনে সাড়া দেবার উদ্দেশ্যে প্রাণীর স্বেচ্ছায় স্থান পরিবর্তন করার প্রক্রিয়াকে চলন বলে।

চলন প্রাণীর স্বতঃপ্রণােদিত হয়ে স্থান পরিবর্তন করার পদ্ধতি। খাদ্য, শিকার বা শত্রুর স্পর্শ জাতীয় উদ্দীপনা এক্টোডার্ম বা এন্ডােডার্মের সংবেদী কোষ সমূহের মাধ্যমে স্নায়ুকোষে সঞ্চারিত হয়।

স্নায়ুকোষের নির্দেশ অনুযায়ী পেশীকোষের পেশীলেজ সংকুচিত হয়। এরপর দেহের ও কর্ষিকার বিশেষ অঞ্চল প্রয়ােজনমত বেঁকে গিয়ে চলন সম্পাদিত হয়। এছাড়া পদচাকতি ও কর্ষিকাগুলােও চলনে ভূমিকা রাখে।

হাইড্রার চলনে অংশগ্রহণকারী কোষসমূহের কাজের বিবরণ

(১) সংবেদী কোষসমূহ উদ্দীপনা গ্রহণ করে।

(২) স্নায়ু কোষসমূহ উক্ত উদ্দীপনা বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট কোষগুলােকে কার্যে নিয়ােজিত করে।

(৩) পেশী আবরণীকোষগুলাে সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে দেহকে বাঁকাতে এবং কর্ষিকাসমূহকে নাড়াতে অংশ নেয়।

(৪) নিডোব্লাস্ট কোষসমূহ জলজ উদ্ভিদ বা অন্য কোন বস্তুকে আঁকড়ে ধরতে সহায়তা করে।

(৫) পাদচাকতির কোষসমূহ ভাসতে এবং ক্ষণপদী কোষগুলাে এমিবয়েড চলনে অংশ নেয়।

হাইড্রার বিভিন্ন ধরনের চলন প্রক্রিয়া (Types of Locomotion)

পরিস্থিতির ভিত্তিতে হাইড্রা নয় ভাবে চলন সম্পাদন করতে পারে। যথাঃ

(১) দেহকে সংকুচিত (খাটো) বা প্রসারিত (লম্বা) করে

হাইড্রাকে স্পর্শ করলে এর দেহের পেশী-আবরণী কোষের সংকোচনের মাধ্যমে দেহকে সংকুচিত করে বলের মত আকৃতি ধারণ করে।

এক্টোডার্মের পেশী আবরণী কোষের পেশীলেজ আড়াআড়িভাবে মেসোগ্লিয়ার মধ্যে বিস্তৃত থাকে। এক্টোডার্মের পেশীলেজের সংকোচনে দেহ খাটো ও মােটা এবং এন্ডোডার্মের পেশীলেজের সংকোচনে দেহ সরু ও লম্বা হয়।

এভাবে দেহের সংকোচন ও প্রসারণের দ্বারা হাইড্রা চলন সম্পন্ন করে।

(২) দেহকে বাঁকা করে ও কাঁত হয়ে বা হেলে দুলে

খাদ্যবস্তু ক্ষুধার্ত হাইড্রার সংস্পর্শে এলে হাইড্রা দেহকে বাঁকা করে কর্ষিকা দিয়ে খাদ্যবস্তুকে ধরে।

এসময় দেহের একপাশের পেশী আবরণী কোষগুলাে সংকুচিত ও তার বিপরীত দিকের পেশী আবরণী কোষগুলাে প্রসারিত হয়ে দেহেকে হেলিয়ে দুলিয়ে বা বাঁকা ও কাত করে চলন সম্পন্ন করে।

(৩) হামাগুড়ি বা লুপিং (Looping)

এক্টোডার্মের পেশী আবরণী কোষের সংকোচন ও প্রসারণ ঘটিয়ে হাইড্রা লুপিং পদ্ধতিতে চলাচল করে।

এ পদ্ধতিতে হাইড্রা তার দেহের অগ্রভাগকে গতিপথের দিকে হেলিয়ে দেয়। এসময় কর্ষিকাগুলাে গতিপথকে আঁকড়ে ধরে। তখন হাইড্রা পাচাকতির উপর সােজা হয়ে দাঁড়ায়।

এই পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে হাইড্রার স্থানান্তর ঘটে। এ পদ্ধতিতে একবার ফাস বা লুপ (Loop) তৈরী হয়। তাছাড়া এপদ্ধতিতে সব সময় হাইড্রার পদচাকতি মাটিতে সংলগ্ন থাকে, কখনও মুক্ত হয়ে উপরে ওঠে না।

এ চলনে সব সময় কৰ্ষিকা সামনে ও পদচাকতি তার পিছনে অনুগামী হয়।

(৪) ডিগবাজী বা সমারসলটিং (Saumersalting)

হাইড্রার দেহের একদিক সংকুচিত ও তার বিপরীত দিক প্রসারিত করে দেহকে বাঁকা করে চলনপথের ভূমির উপরে কর্ষিকাগুলাে স্থাপন করে।

তারপর পদচাকতিকে বিমুক্ত করে প্রায় ১৮০° কোণে বাকিয়ে চলন পথের উপরে চলনের অগ্রদিকে নতুন অবস্থানে স্থাপন করে। এরপর হাইড্রা কর্ষিকাগুলােকে বিমুক্ত করে পদচাকতির উপর ভর করে সােজা হয়ে দাঁড়ায়।

এ পদ্ধতিতে হাইড্রা একবার কর্ষিকার উপর এবং তারপরের বার পদচাকতির উপর ভর করে দাঁড়ায়। তাছাড়া এ পদ্ধতিতে একবার পদচাকতি সামনে ও কর্ষিকা পিছনে অবস্থান করে এবং তারপরের বার কর্ষিকা সামনে ও পদচাকতি পিছনে চলন তলের উপর সংলগ্ন হয়।

এই চলনের সময় দুইবার লুপ তৈরী হয়। এই পদ্ধতিতে চলনকে সমারসলটিং (Saumersalting) চলন বলে।

 (৫) গ্লাইডিং বা এমিবয়েড চলন বা পাদচাকতির সাহায্যে হাঁটা

হাইড্রার পদচাকতির গ্রন্থিকোষ থেকে নিঃসৃত পিচ্ছিল রসে চলনতলকে পিচ্ছিল করে হাইড্রা গ্লাইডিং বা এমিবয়েড চলন সম্পন্ন করে।এসময় পদচাকতির ক্ষণপদযুক্ত কোষের ক্ষণপদগুলাে ব্যবহৃত হয়।

(৬) কর্ষিকার সাহায্যে হাঁটা

হাইড্রা কর্ষিকার উপর ভর করে এবং পদচাকতিকে মুক্ত করে চলনতলের উপর সােজা হয়ে দাড়ায়। এরপর কর্ষিকাকে পায়ের মত নাড়াচাড়া করে হেঁটে বেড়ায়।

(৭) ভাসা (Floating)

পদচাকতির এক্টোডার্মের গ্রন্থিকোষ থেকে গ্যাসীয় বুদবুদ তৈরী করে হাইড্রা দেহকে হাল্কা করে। এরপর হাইড্রা নিষ্ক্রিয়ভাবে পানির স্রোতের সাহায্যে ভেসে বেড়ায়।

(৮) সাঁতার (Swimming)

হাইড্রা দেহকে আনুভূমিকভাবে বা পানির সাথে সমান্তরালভাবে রেখে কর্ষিকাগুলােকে পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে এবং সঞ্চালিত করে সাঁতার কাটে।

(৯) আরােহন-অবারােহন (Climbing)

হাইড্রা কখনও কখনও কর্ষিকাগুলােকে প্রসারিত করে জলজ উদ্ভিদ বা পানিতে নিমিজ্জিত বা ভাসমান কোন বস্তুকে আঁকড়ে ধরে। এরপর হাইড্রা পাচাকতিকে বিমুক্ত করে নতুনস্থানে স্থাপন করে নীচে থেকে উপরে আরােহন অথবা উপর থেকে নীচে অবারােহন করে।

হাইড্রার লুপিং ও সমারসন্টিং চলনের পার্থক্য

তুলনার বিষয়লুপিং বা হামাগুড়িসমারসল্টিং বা ডিগবাজি
১।কর্ষিকার দিক্মুখিতা এ প্রকার চলনে কর্ষিকাগুলো সব সময় গতিপথের দিকে থাকে একবার কর্ষিকা এবং আরেকবার পাদচাকতি গতিপথের দিকে থাকে ।
২।পাদচাকতিসব সময় নিচের দিকে থাকে চলনের সময় হাইড্রা কর্ষিকার উপর ভর দেইয়।ফলে পাদচাকতি উপরের দিকে আসে ।
৩।লুপ গঠনএকবার চলন সম্পন্ন হতে একবার লুপ গঠিত হয়।একবার চলন সম্পন্ন হতে দুইবার লুপ গঠিত হয় ।
৪।অতিক্রান্ত দূরত্ব একটি হামাগুড়িতে দেহের দৈর্ঘ্য অপেক্ষা কম দূরত্ব অতিক্রম করে ।একটি ডিগবাজিতে দেহের প্রায় দ্বিগুণ দূরত্ব অতিক্রম করে ।
৫।চলনের গতি অপেক্ষাকৃত মন্থর।অপেক্ষাকৃত দ্রুত।

Leave a Comment