রুই মাছের প্রজনন ও জীবনচক্র।রুই মাছের নিষেক।রুই মাছের প্রাকৃতিক সংরক্ষণ

রুই মাছের প্রজনন ও জীবনচক্র (Reproduction and life cycle of L. rohita)

রুই মাছের প্রজনন (Reproduction)

রুই মাছ দুবছর বয়সে জননক্ষম হয়ে ওঠে। প্রকৃতিতে উপযুক্ত পরিবেশ ছাড়া রুই মাছ প্রজনন করে না। কোন বদ্ধ জলাশয়ে রুই মাছের স্পনিং (Spawning) বা ডিম ত্যাগ ঘটে না। স্রোতযুক্ত নদীর পানিতে, খাল, প্লাবনভূমি ইত্যাদিতে এরা ডিম ছাড়ে। সাধারণত স্ত্রী মাছ ৫১-৭০ সে.মি. এবং পুরুষ মাছ ৬৫ সে.মি. লম্বা হলে প্রজননের জন্য প্রস্তুত হয়। এক প্রজনন ঋতুতে ৩৫ লক্ষ ডিম দেয়। তবে গড়ে প্রতিটি পূর্ণবয়ষ্ক মাছে প্রায় ১ লক্ষ করে ডিম থাকে। সাধারণত জুলাই আগস্ট মাসে রুই মাছ প্রজননে অংশ নেয়। এরা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।

রুই মাছের নিষেক (Fertilization)

শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনের ফলে জাইগোট উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াকে নিষেক বলে। ভরা বর্ষায় যখন নদীতে প্রবল স্রোত থাকে এবং আবহাওয়া মেঘলা আর মুষলধারে বৃষ্টি হয় তখন রুই মাছ নদীর অগভীর অংশে ঝাঁক বেঁধে ডিম ছাড়তে উদ্বুদ্ধ হয়। প্রজননের সময় নদীর পানির তাপমাত্রা ২৭-৩০ সেলসিয়াস হয় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে O2 থাকে।

নদীর পানিতে প্রচুর পরিমাণে ভাসমান জৈব ও অজৈব কণা থাকার কারণে পানি ঘোলা হয়ে যায়। পানির ঘোলাটে অবস্থায় রুই মাছ প্রচণ্ড ছুটাছুটি করে। অধিকাংশ কঠিনাস্থি মাছের ডিম পানির উপরে ভেসে থাকে। এদেরকে পেলাজিক ডিম বলে।

কিন্তু রুই মাছের ডিম পানির তলায় ডুবে যায়। এ ধরনের ডিমকে ডিমারসাল ডিম বলে। প্রজননের সময় পুরুষ মাছ স্ত্রী মাছকে অনুসরণ করে। স্ত্রী মাছ প্রথমে পানিতে ডিম (egg) ছাড়লে পুরুষ মাছ তার উপর বীর্য (sperm) ছড়িয়ে দেয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে নিষেক সম্পন্ন হয়। রুই মাছের নিষেক দেহের বাইরে নদীর পানিতে সম্পন্ন হয় বলে একে বহিঃনিষেক (External fertilization) বলে।

রুই মাছের জীবন চক্র (Life cycle)

রুই মাছ একলিঙ্গিক। নিষেকের পর ডিম জাইগোটে (2n) পরিণত হয়। জাইগোট পরবর্তীতে বিভাজিত হয়ে মরুলা, ব্লাস্টুলা ও গ্যাস্ট্রুলা দশায় পরিণত হয়। গ্যাস্ট্রুলা দশা পরবর্তীতে লার্ভা দশায় পরিণত হয়। এ লার্ভা দশা পরবর্তীতে রেণু পোনা (Hatchlings), ধানী পোনা (Fry), আঙ্গুরী পোনায় (Fingerlings) পরিণত হয়। ২৫ দিন বয়সী পোনাটিকে পুর্ণাঙ্গ মাছের সকল বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।

এসময় পোনার মুখের দু’পাশে স্পর্শী (Barbel) সুস্পষ্ট হয় এবং দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩০ মি. মি. হয়। এভাবে রুই মাছ সাধারণত দেড় থেকে দুই বছর বয়সে যৌন পরিপক্কতা লাভ করে।

রুই মাছের প্রাকৃতিক সংরক্ষণ

রুই মাছ বাংলাদেশের অতি পরিচিত ও সুস্বাদু মাছ। রুই মাছ Cyprinidae গোত্রভুক্ত প্রজাতি। এ গোত্রভুক্ত মাছগুলোকে সাধারণত কার্প জাতীয় মাছ বলে। রুই মাছ ছাড়াও বাংলাদেশে কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস জাতীয় কার্প মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু বিভিন্ন হ্যাচারীতে চাষের কারণে সীমিত ও নির্দিষ্ট মাছের মধ্যে অন্তঃপ্রজননের ফলে জিনগত বৈচিত্র্য বিনষ্ট হয়।

রোগাক্রান্ত মাছের আধিক্য দেখা যায়। এছাড়া নদী ভরাট করা, নদীর প্রবাহ পরিবর্তিত হওয়া, হাওরবাওর, খাল, বিল ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ার কারণে এ সম্পদ আজ হুমকির সম্মুখীন। এ সম্পদকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে এবং এর যথাযথ যতড়ব নিতে হবে। নিম্নে রুই মাছকে প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষণের বিষয়টি আলোচনা করা হলো-

১। হালদা নদীতে রুই মাছ সংরক্ষণ: চট্টগ্রামের হালদা নদী এশিয়ার বৃহত্তম একটি প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র। হালদা নদীর বৈশিষ্ট্য হলো এটি এমন একটি নদী যা বাংলাদেশে উৎপত্তি হয়ে বাংলাদেশে পতিত হয়েছে। হালদা নদীকে মা মাছের মেটারনিটি ক্লিনিকও বলা হয়ে থাকে। হালদা নদী থেকেই রুই জাতীয় মাছ, যেমন রুই, মৃগেল, কাতলা, কালিবাউস মাছের ডিম সরাসরি সংগ্রহ করা হয়।

কিন্তু রাষ্ট্রের সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হালদা নদীর ঐতিহ্য আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নদী দূষণ, হালদা নদী সংলগড়ব এলাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে শিল্প কারখানা গড়ে ওঠা, হালদা নদীর অক্স বা বাঁকসমূহ কেটে মাছের প্রজনন বান্ধব পরিবেশ নষ্ট করা, সুইচগেট নির্মাণ, প্রজনন ঋতুতে নির্বিচারে ডিমওয়ালা বা ব্রুড মাছ ধরাসহ নানা মানবসৃষ্ট কারণে এ নদীতে রুই মাছের প্রজনন কমে গেছে।

আশার কথা হলো সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে হালদা নদীকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছে। এমতাবস্থায় সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে।

২। রুই মাছের অভয়াশ্রম: নির্দিষ্ট প্রজাতির মাছ বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট প্রজনন ক্ষেত্রে বংশবৃদ্ধি করে থাকে। তাই অবাধ বিচরণ ও প্রজননের জন্য সুনির্দিষ্ট জলাশয় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে সরকার থেকে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যেমন- হালদা নদীর মদুনা ঘাট এলাকা, বিলাইছড়ি এলাকাকে মৌসুমী অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

যেহেতু নির্দিষ্ট সময় ব্যতীত এ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো অরক্ষিত থাকে তাই কিছু মানুষ নিষেধ অমান্য করে সারা বছর মাছ ধরে থাকে। তাই এসব এলাকাগুলোকে কঠিন নজরদারির মধ্যে রেখে সারা বছর ব্যাপী অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা দরকার।

৩। রুই মাছের পোনা মজুদ: নদী-নালা, খাল-বিল অবৈধ ভাবে ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ার কারণে মাছের উৎপাদন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। বদ্ধ বিল ও জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য পোনা মজুদ করা দরকার। প্রতি বছরে জানুয়ারী থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত একবার ও জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত একবার মোট দুইবার রুই মাছের পোনা মজুদ করা যায়।

৪। পরিবেশ ব্যবস্থাপনা: হালদা নদী বাংলাদেশের একমাত্র জোয়ার ভাটার নদী যেখান থেকে মৎস্যচাষীরা পোনার বদলে রুই মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করে নিয়ে যান। হালদা নদীতে রুই মাছের বিশুদ্ধ জিন পাওয়া যায় তাই এ নদী সংরক্ষণ করা অত্যাবশ্যক। এছাড়া হালদা নদীর তীরবর্তী যেসব দূষণ সৃষ্টিকারী শিল্প-প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলো বন্ধ করতে হবে। অপরিকল্পিত বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।

৫। জনসচেতনতা: প্রজননক্ষম মাতৃ রুই মাছের গুরুত্ব, মাছের জীবনচμ, মাছ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জ্ঞান সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। নির্দিষ্ট নিচের মাপের (সাধারণত ৮-৯ ইঞ্চি) কোন রুই মাছের পোনা যাতে বাজারে বিক্রি না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এছাড়া জলাশয়ের পাশের এলাকার জমিতে কীটনাশক ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

কলকারখানার নিক্ষিপ্ত বর্জ্য যাতে সরাসরি জলাশয়ে মিশে জলাশয়ের পানিকে দূষিত করতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে মৎস আইন সংশোধন করতে হবে এবং আইনের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Comment