অ্যান্টিজেন(Antigen)

অ্যান্টিজেন(Antigen)

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অ্যান্টিজেনের ভূমিকা  অ্যান্টিজেন (Antigen)

অ্যান্টিজেন হচ্ছে যেকোনাে বিজাতীয় প্রােটিন বা পলিস্যাকারাইড, যা প্রাণিদেহে থাকে না। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা এদের নিঃসৃত বিষাক্ত পদার্থ অন্যদেহের প্রতিটি কোষে যে প্রােটিন রয়েছে তা নির্দিষ্ট প্রাণিদেহের জন্য অপরিচিত এবং এটিই অ্যান্টিজেন হিসেবে কাজ করে।

একটি অ্যান্টিজেন প্রাণিদেহকে একটি নির্দিষ্টি অ্যান্টিবডি উৎপাদনে উদ্দীপ্ত করে। অ্যান্টিজেন শব্দটি Antibody generating এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

যে সব বিজাতীয় জীবাণু বা অধিবিষ দেহে প্রবেশ করলে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি হয় তাদের অ্যান্টিজেন বলে।

অ্যান্টিজেনের বিশেষায়িত কিছু থাকে তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে ইমিউনাে সাড়া (immunogenicity) সৃষ্টির ক্ষমতা থাকতে হবে এবং এরা অবশই non-self বা বহিরাগত বস্তু হবে। অধিকাংশই অ্যান্টিজেন প্রােটিনধর্মী ও জটিল গঠনবিশিষ্ট।

এদের আণবিক ওজন সাধারণত ১০,০০০ ডাল্টনের অধিক। তবে অ্যান্টিজেন জটিল শর্করা অর্থাৎ বৃহদাকার পলিস্যাকারাইড বা বৃহদাকার লাইপােপ্রােটিন বা মিউকোপলিস্যাকারাইড বা গ্লাইকোপ্রােটিন বা নিউক্লিওপ্রােটিনও হতে পারে। অ্যান্টিজেন অ্যান্টিবডির সঙ্গে সংযুক্ত বা আবদ্ধ হতে পারে।

অ্যান্টিজেনধর্মী জটিল প্রােটিনের যে অংশ অ্যান্টিবডির সঙ্গে সংযুক্ত হয় তাকে এনিটোপ (enitope) বা অ্যান্টিজেনিক ডিটারমিন্যান্ট (antigentic determinant) বা নির্ধারক বলে।

কোনাে কোনাে অ্যান্টিজেনধর্মী প্রােটিনের বা একটি অ্যান্টিজেনের একাধিক এপিটোপ থাকতে পারে। কখনাে কখনাে বিশেষ ক্ষুদ্র রাসায়নিক অণু (যেমন- নানা ধরনের ওষুধ,ধূলাবালির রাসায়নিক উপাদান, নানা ধরনের শিল্পজাত রাসায়নিক পদার্থ, ত্বকের শুকনাে আঁশের অপজাত পদার্থ, প্রাণীর খুশকিজাত পদার্থ প্রভৃতি) নিজে অ্যান্টিজেন না হলেও কোনাে বৃহৎ প্রােটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অ্যান্টিজেনধর্মী হয়ে পড়ে ও অ্যান্টিবডির সঙ্গে আবদ্ধ হয়। এমন পদার্থকে বলা হয় হ্যাপ্টেন (hapten)।

হ্যাপ্টেনগুলাে বিশেষ প্রােটিনের ওপর এপিটোপ হিসেবে কাজ করে।

মানুষের রক্তে প্রধান তিন ধরনের অ্যান্টিজেন থাকে। যথা-

[A, B ও Rh]অ্যান্টিজেনের বৈশিষ্ট্য

১। অ্যান্টিজেনের যে বিশেষ স্থানে অ্যান্টিবডি যুক্ত হয় তাকে অ্যান্টিজেনিক নির্ধারক স্থান (antigentic determinant site)অথবা এপিটোপ (epitope) বলে।

এপিটোপ নির্দিষ্ট রাসায়নিক গ্রুপ থাকে যার সঙ্গে অ্যান্টিবডির অ্যান্টিজেন বাইন্ডিং সাইট (antigen binding site) বা প্যারাটোপ (paratop) যুক্ত হয়।

২। অ্যান্টিজেন নির্ধারক স্থানগুলােকে অন্য কথায় ভ্যালেন্স (valence) বলে। বেশিরভাগ অ্যান্টিজেনের অনেকগুলাে অ্যান্টিজেন নির্ধারক স্থান থাকে বলে এগুলােকে মালটিভ্যালেন্ট (mutivallent) বলে।

৩। অ্যান্টিজেনের দুটি বিশেষ ক্ষমতা থাকে, যেমন (i) অনাক্রম্যতাকরণ (immunogenecity)- নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি উৎপাদনের ক্ষমতা; ও (ii) বিক্রিয়াকরণ (reactivity)- উৎপন্ন অ্যান্টিবডির সঙ্গে অ্যান্টিজেনের বিক্রিয়া করার ক্ষমতা।

যেসব অ্যান্টিজেনের এই দুটি ক্ষমতা থাকে তাদের সম্পূর্ণ অ্যান্টিজেন (complete antigen) বলে।

অ্যান্টিজেনের উদাহরণ- সমগ্র অণুজীব (microbs), যেমন- ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ইত্যাদি অ্যান্টিজেন হিসেবে কাজ করে;আবার অণুজীবের কয়েকটি উপাংশও অ্যান্টিজেন হিসেবে কাজ করে।

ব্যাকটেরিয়ার কোনাে অংশ, যেমন- ফ্লাজেলা,ক্যাপসিউল ও কোষ প্রাচীর অ্যান্টিজেন হিসেবে কাজ করে অর্থাৎ অ্যান্টিজেনধর্মী (antigenic)।ব্যাকটেরিয়াঘটিত অধিবিষ (bacterial toxins) তীব্র অ্যান্টিজেনধর্মী। অণুজীব ছাড়া অন্যান্য পদার্থ, যেমন- ডিমের সাদা অংশ, ফুলের রেণু,গ্রহণ অযােগ্য রক্তকণিকা (incompatible blood cells), কলাকোষের এবং আন্তরযন্ত্ৰীয় অঙ্গের প্রতিস্থাপন(transplantation) ইত্যাদি অ্যান্টিজেনের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

অ্যান্টিজেনের প্রকারভেদ

অ্যান্টিজেন দু’রকমের হয়। যথা -এক্সোজেনাস (Exogenous) ও এন্ডােজেনাস(Endogenous)

১। এক্সোজেনাস অ্যান্টিজেন (Exogenous antigen)

যে সব অ্যান্টিজেন প্রাণিদেহের বাইরে উৎপন্ন হয় তাদের এক্সোজেনাস অ্যান্টিজেন বলে। যেমন- পরাগ রেণু, দূষক পদার্থ, ভেষজ পদার্থ, রােগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ইত্যাদি।

২। এন্ডােজেনাস অ্যান্টিজেন (Endogenous antigen)

যে সব অ্যান্টিজেন প্রাণিদেহের ভিতরে উৎপন্ন হয় তাদের এন্ডােজেনাস অ্যান্টিজেন বলে। যেমন- ইঁদুর, বিড়াল, ভেড়া, ঘােড়া প্রভৃতির লােহিত কণিকায় অবস্থিত ফরম্যান অ্যান্টিজেন (foreman antigen) স্তন্যপায়ী প্রাণীর হৃদপিণ্ডে অবস্থিত কার্ডিওলিপিন (cardiolipin) অ্যান্টিজেন এই রকমের অ্যান্টিজেন।

এই প্রকার অ্যান্টিজেন বিভিন্ন রকমের হয়। যেমন-

ক. জেনােজেনিক অ্যান্টিজেন (Xenogenic antigen)-

জাতিজনি গতভাবে পৃথক প্রজাতির দেহে যে সব সমপ্রকৃতির অ্যান্টিজেন দেখা যায় তাদের জেনােজেনিক অ্যান্টিজেন বলে।

খ. অটোলােগাস অ্যান্টিজেন (Autologus antigen)-

বিশেষ পরিস্থিতিতে যখন দেহ গঠনকারী কোনাে উপাদান অ্যান্টিজেনহিসেবে কাজ করে তখন তাকে অটোলােগাস অ্যান্টিজেন বলে ।

গ. অ্যালােজেনিক অ্যান্টিজেন (Allogenic antigen)-

একই প্রজাতির দুটি প্রাণীর যে সব অ্যান্টিজেন জিনগতভাবে নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু অ্যান্টিজেনিক ভিটামিন্যান্টস দ্বারা পরস্পরের থেকে পৃথক, তাদের অ্যালােজেনিক অ্যান্টিজেন বলে। এ ধরনের অ্যান্টিজেন লােহিত কণিকা, শ্বেতকণিকা, অণুচক্রিকা, সিরাম প্রােটিন প্রভৃতিতে থাকে।

অ্যান্টিজেনের সাধারণ ধর্ম (General properties of antigen)

অ্যান্টিজেনের প্রধান কয়েকটি ধর্ম হলাে-

১। রাসায়নিক প্রকৃতি- অ্যান্টিজেন প্রধানত প্রােটিন। কিন্তু অ্যান্টিজেন পলিস্যাকারাইড ও লাইপ্রােপ্রােটিন জাতীয় হয়।

২। বহিরাগত ধর্ম- বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া অ্যান্টিজেন সাধারণত বহিরাগত হয়।

৩। আণবিক ভর- কার্যকরী অ্যান্টিজেনের আণবিক ভর সাধারণত 10,000 ডাল্টনের বেশি। সর্বাপেক্ষা ভালাে। অ্যান্টিজেনের আণবিক ভর মােটামুটি 10,000 ডাল্টন হওয়া প্রয়ােজন। ইনসুলিনের আণবিক ভর 5000 D।

৪। উপলব্ধি ক্ষমতা- কোনাে পদার্থকে অ্যান্টিজেন হতে হলে তার এমন কিছু গঠন বা ডিটারমিন্যান্ট গ্রুপ থাকা প্রয়ােজন যা অনাক্রম্য তন্ত্রের বিভিন্ন উপাদান কর্তৃক চিহ্নিত হতে পারে।

৫। প্রজাতি নির্দিষ্টতা- একই প্রজাতির অন্তর্গত সব প্রাণীর কলাতে প্রজাতি নির্দিষ্টতা অ্যান্টিজেন থাকে।

৬। অঙ্গ নির্দিষ্টতা- নির্দিষ্ট কোনাে কলা বা অঙ্গে অঙ্গ নির্দিষ্টতা অ্যান্টিজেন থাকে।

Leave a Comment