তৃতীয় অধ্যায়ঃমানব শারীরতত্ত্ব(পরিপাক ও পরিশোষন)

পরিপাক কি?

পরিপাক নালি (Digestive tract)

পরিপাকতন্ত্রের যে নলাকার অংশে পরিপাক সংঘটিত হয় তাকে পরিপাক নালি বলে।

মানুষের পরিপাক নালি মুখ থেকে পায়ু পর্যন্ত ৮-১০ মিটার বিস্তৃত দীর্ঘ নালি বিশেষ যা কোথাও থলির ন্যায় স্ফীত আবার কোথাও কুণ্ডলীকৃত। পরিপাক নালির বিভিন্ন অংশ -মুখছিদ্র,মুখবিবর, গলবিল, অন্ননালি, পাকস্থলি, ক্ষুদ্রান্ত্র (ডিওডেনাম, জেজুনাম ও ইলিয়াম), বৃহদন্ত্র (সিকাম, কোলন ও মলাশয়)।

পরিপাক নালির বিভিন্ন অংশ

মুখ

পরিপাক নালির শুরু মুখ থেকে। মুখ নাসারন্ধ্রের নিচে অবস্থিত একটি আড়াআড়ি ছিদ্র, যা উপরের ও নিচের ঠোঁট দ্বারা বেষ্টিত থাকে। মুখছিদ্রের মাধ্যমে খাদ্য বস্তু মুখবিবরে প্রবেশ করে।

মুখবিবর

মুখ পরবর্তী অংশটি মুখবিবর। এর ভেতরে কয়েকটি অঙ্গ অবস্থিত। যেমন- দাঁত, মাড়ি, জিহবা, গাল ও তালু। মুখ বিবরের ঊর্ধ্ব প্রাচীর তালুর অস্থি ও পেশি দিয়ে, সামনের প্রাচীর ঠোঁটের পেশি দিয়ে এবং পার্শ্ব প্রাচীর গালের পেশি দিয়ে গঠিত। তালুর অগ্রভাগ অস্থিনির্মিত এবং শক্ত, পেছনের অংশ মাংসল ও নরম। তালুর পেছনের অংশের মধ্যভাগ থেকে একটি অপেক্ষাকৃত সরু আলজিহবা মুখবিবরে ঝুলে থাকে। মানুষের উধ্ব ও নিম্ন চোয়াল দাঁতযুক্ত।

এছাড়া মুখবিবরে তিন জোড়া লালাগ্রন্থি থাকে। নিম্নে চোয়ালের অস্থির সাথে জিহ্বাযুক্ত থাকে। পৃষ্ঠতলের উপর থাকে স্বাদকোরক এগুলাে বিভিন্ন রাসায়নিক বস্তুর প্রতি সংবেদনশীল। জিহ্বার অগ্রভাগ মিষ্টি, দুই পার্শ্ব নােনা, পশ্চাৎ ভাগের দুই পার্শ্ব টক এবং পেছনের দিক তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করে।

কাজ

১।দাঁত খাদ্য দ্রব্যকে কাটা, ছেড়া ও পেষণে সাহায্য করে।

২।জিহ্বা খাদ্য দ্রব্যের স্বাদ গ্রহণ করে এবং পেষণের সময় লালারস মিশ্রিত করে খাদ্য দ্রব্যকে পিচ্ছিল করে পেছনে ঠেলে দেয়।

৩।লালাগ্রন্থি থেকে নিঃসৃত “মিউসিন” খাদ্যকে পিচ্ছিল করে আর টায়ালিন ও মল্টেজ এনজাইম খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে।

গলবিল

মুখবিবরের ঠিক পেছনে প্রায় ১০ সে.মি. দীর্ঘ চওড়া অংশকে গলবিল বলে।

কাজঃ গলবিল খাদ্যকে মুখবিবর থেকে অন্ননালিতে পৌঁছে দেয়।

অন্ননালি

গলবিলের ঠিক পেছনে প্রায় ২৫ সে.মি. লম্বা নলাকার অংশই অন্ননালি যা, শ্বাসনালির পেছন ও বক্ষ গহ্বরের

মধ্যে দিয়ে উদরে অবস্থিত পাকস্থলিতে শেষ হয়।

কাজ: অন্ননালির পেশির সংকোচনে খাদ্যদ্রব্য নালি পথে পাকস্থলিতে প্রবেশ করে।

পাকস্থলি

বক্ষ গহ্বল্লে ডায়াফ্রামের নীচে উদরের উপরের অংশে প্রায় ২৫ সে. মি. লম্বা ও ১৫ সে.মি. চওড়া বাঁকানাে থলির মত অংশই পাকস্থলি। একে কয়েকটি অংশে ভাগ করা যায়। যেমন- কার্ডিয়া, ফান্ডাস,ছােট-বড় বাঁক,পাইরােলাস। পাকস্থলির প্রত্যেক অংশের মিউকোসা স্তরে প্রায় ৪০ মিলিয়ন (৪ কোটি) গ্যাস্ট্রিক গ্রন্থি থাকে। এই গ্যাস্ট্রিক গ্রন্থিগুলাে থেকে প্রতিদিন প্রায় দু’লিটার গ্যাস্ট্রিক রস ক্ষরিত হয়।

পাকস্থলীর কাজ

১।খাদ্যদ্রব্যকে সাময়িকভাবে জমা রাখে এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে।

২।HCl জীবানুনাশক হিসেবে কাজ করে।

মিউসিন HCl-এর ক্ষতিকর ভূমিকা থেকে পাকস্থলির প্রাচীরকে রক্ষা করে।

৩।গ্যাস্ট্রিক রসের এনজাইমগুলাে HCl-এর উপস্থিতিতে আমিষ ও স্নেহজাতীয় খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে।

ক্ষুদ্রান্ত্র

পাকস্থলির পাইলােরাস অংশের পর থেকে ইলিওকোলি পর্যন্ত প্রায় ৬-৭ মিটার লম্বা বিস্তৃত অংশ ক্ষুদ্রান্ত্র।এটি আবার ৩ অংশে বিভক্ত, যথা- ডিওডেনাম, জেজুনাম ও ইলিয়াম। ডিওডেনামে মূলত: অগ্নাশয়িক রসের এনজাইমের ক্রিয়া এবং জেজুনাম ও ইলিয়ামে আন্ত্রিক রসের এনজাইমের ক্রিয়ার পরিপাক ঘটে।

ডিওডেনামে মূলত: কার্বোহাইড্রেট, প্রােটিন ও লিপিডের পরিপাক ঘটে। অমধর্মী পাকমণ্ড পাকস্থলি থেকে ডিওডেনামে প্রবেশ করলে যকৃত থেকে নিঃসৃত ও পিত্তথলিতে সঞ্চিত পিত্তরস নালিপথে ডিওডেনামে প্রবেশ করে ক্ষারীয় মাধ্যম সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে অগ্ন্যাশয় থেকে রস নিঃসৃত হয়ে পাকমণ্ডের অম্লত্বের প্রশমন ঘটায়। অগ্ন্যাশয় রসের এনজাইমসমূহ এ মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে পরিপাকে অংশ নেয়।

বৃহদন্ত্র

পৌষ্টিকনালির শেষােক্ত বৃহৎ নলাকার অংশ যা ক্ষুদ্রান্ত্রের পর থেকে প্রায় ২ মিটার লম্বা মলাশয় পর্যন্ত বিস্তৃত। বৃহদন্ত্র তিনটি অংশে বিভক্ত। যথা- সিকাম, কোলন ও মলাশয়।

সিকাম

 বৃহদন্ত্রের প্রথম, বড় স্ফীত ও গােলাকার থলের মতাে অংশকে সিকাম বলে। সিকাম লম্বায় ৬ সে. মি. এবং প্রস্থে ৭.৫ সে.মি.। সিকাম থেকে একটি ক্ষুদ্র আঙ্গুল ও বন্ধ থলের ন্যায় প্রসারিত অংশকে অ্যাপেনডিক্স বলা হয়। এটি একটি নিষ্ক্রিয় অঙ্গ।

কোলন

সিকামের পরবর্তী মােটা নলাকার অংশকে কোলন বলে। কোলন ৪টি অংশে বিভক্ত এবং প্রায় ১৫০-১৯০ সে.মি. লম্বা। কোলনের প্রথম ও সিকাম সংলগ্ন যে অংশ যকৃত বরাবর উর্ধ্বমুখীভাবে প্রসারিত থাকে, তাকে “উর্ধ্বগামী কোলন” বলে। এটি প্রায় ১৫ সে.মি. লম্বা।

বামদিকে উধ্বর্গামী এবং নিম্নগামী কোলনের সাথে সমকোণে ও আড়াআড়িভাবে বিস্তৃত অংশকে “অনুপ্রস্থ কোলন” বলে। এটি প্রায় ২০-৩০ সে.মি. লম্বা। অনুপ্রস্থ অংশ থেকে নিম্নমুখীভাবে সরাসরি নিচে যে অংশ মলাশয়ে মিলিত হয় তাকে “নিম্নগামী কোলন” বলে।

এটি প্রায় ২০-২৫ সে. মি.। কোলনের যে অংশটি শ্রোণি গহ্বরে প্রবেশ করে S-আকৃতিতে পরিণত হয়, তাকে সিগময়েড কোলন বলে।

মলাশয়

বৃহদন্ত্রের শেষ প্রান্ত শ্রোণিদেশে অবস্থিত প্রশস্ত অংশটিকে মলাশয় বলে। এটি প্রায় ৫ সে.মি. লম্বা। এর অন্তঃপ্রাচীরের মিউকোসা ভাঁজ সৃষ্টি করে ভাঁজগুলাের মাঝে অবতল মলাশয়িক সাইনাস থাকে। মলাশয়েরর নিম্নাংশ স্ফীত হয়ে মলাশয়িক অ্যাম্পুলা গঠন করে ।

বৃহদান্ত্রের কাজ

১।বৃহদন্ত্রে প্রতিদিন প্রায় ১৩৫ গ্রাম আর্দ্র মল তৈরি হয়, পানি শােষিত হয় এবং খাদ্যাংশের গাঁজন বা পঁচন ঘটে।

২।বৃহদন্ত্রের মাধ্যমে মল পায়ুপথে বাইরে নির্গত হয়।

পায়ু

মলাশয় পায়ুছিদ্র পথে বাইরে উন্মুক্ত। পায়ুপথ দুটি পেশিদ্বারা গঠিত। একটি বহিঃস্থ অন্যটি অন্তঃস্থ। অন্তঃস্থটি মসৃণ পেশিদ্বারা গঠিত এবং অনৈচ্ছিকভাবে সংকুচিত হয় এবং বহিঃস্থটি জ্ঞাতসারে নিয়ন্ত্রিত হয়।

পায়ুর কাজ: স্নায়ু নিয়ন্ত্রিত হয়ে পায়ু উন্মুক্ত ও বন্ধ হয়ে মলত্যাগে অংশ নেয়।

Leave a Comment