জেনেটিক্সে ব্যবহৃত কয়েকটি প্রয়ােজনীয় সংজ্ঞা

জেনেটিক্সে ব্যবহৃত কয়েকটি প্রয়ােজনীয় সংজ্ঞা

জিন (Gene)

W.L Johannsen (গ্রিক genes=born) ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে জিন শব্দটি ব্যবহার করেন। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে মেন্ডেল এর অনুমানকৃত জীবের বৈশিষ্ট্য নির্ধারক বস্তুটি হলাে এলিমেন্টিস বা ফ্যাক্টর (elementes or factor) যা পরবর্তীকালে জিন নামে অভিহিত হয়।

জিন হচ্ছে বংশগতির মৌলিক একক (basic unit of heredity) এবং এরা বংশ পরম্পরায় সঞ্চারিত হয়ে বংশগতিধারা অব্যাহত রাখে। জিনকে সংজ্ঞায়িত করা যায় এভাবে- জিন হচ্ছে পলিপেপটাইড সংশ্লেষের। সংকেত প্রদানকারী DNA অণুর অংশ বিশেষ (gene is a part of a DNA molecule ode for polypeptide synthesis)।

লােকাস (Locus.PI-Loci)

ক্রোমােসােমে একটি জিনের অবস্থানকে লােকাস বলে।

অ্যালিল (Allel)

ক্রোমােসােমের একই লােকাসে অবস্থানকারী জিনগুলােকে পরস্পরের অ্যালিল বলা হয়। জিনগুলাের একত্রে অবস্থান করাকে অ্যালিলােমর্ফ (Allelomorph) বলে।

মনে করি, মানুষে বাদামী চোখের রং এর জন্য দায়ী জিন B ও নীল চোখের রং এর জন্য দায়ী জিন b পরস্পরের অ্যালিল।

জিনােটাইপ (Genotype)

জীবদেহের দৃশ্যমান অথবা সুপ্ত বেশিষ্ট্যগুলাের নিয়ন্ত্রক জিনসমূহের গঠনকে জিনােটাইপ বলে।

মনেকরি, মটরশুটি গাছের লম্বা কাণ্ডের জন্য T জিন এবং বামন কাণ্ডের জন্য T জিন দায়ী। অতএব TT, tt, Tt যথাক্রমে বিশুদ্ধ লম্বা, বিশুদ্ধ বামন ও সঙ্কর (hrbrid) লম্বা মটরশুটি গাছের জিনােটাইপ।

ফিনােটাইপ (Phenotype)

জীবদেহের দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যসমূহকে ফিনােটাইপ বলে। ফিনােটাইপ প্রকৃতপক্ষে জিনােটাইপের জিনসমূহের বাহ্যিক প্রকাশ। যেমন- লম্বা ও বামন মটরশুটি গাছে উচ্চতা সম্পর্কিত বাহ্যিক প্রকাশগুলাে যথাক্রমে TT বা Tt ও tt জিনােটাইপগুলাের ফিনােটাইপ।

হােমােজাইগাস (HomoZygous) ও হেটারােজাইগাস (Heterozygous)

জীবে একটি বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী জিন জোড়া একই রকমের (উভয় জিনই প্রকট বা প্রচ্ছন্ন) হলে তাকে হােমােজাইগাস জীব বলে। জিন জোড়া ভিন্ন রকমের হলে সে জীবকে হেটারােজাইগাস জীব বলে।

যেমন- বিশুদ্ধ লম্বা মটরশুটি গাছে একটি প্রকার দুটি প্রকট জিন (TT) থাকে। অতএব, এটি হােমােজাইগাস লম্বা। কিন্তু সঙ্কর লম্বা গাছে একটি প্রকট জিন ও একটি প্রচ্ছন্ন জিন থাকে। অতএব, তাকে হেটারােজাইগাস লম্বা (Tt) বলে।

প্রকট (Dominant) ও প্রচ্ছন্ন (Recessive)

এক জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীবে সঙ্করায়ন ঘটালে ১ম অপত্য বংশে সঙ্কর জীবে ঐ বৈশিষ্ট্য দুটির যেটি প্রকাশিত হয় তাকে প্রকট বৈশিষ্ট্য এবং যে বৈশিষ্ট্য সুপ্ত থাকে তাকে প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য বলে।

যেমন- বিশুদ্ধ লম্বা মটরশুটি গাছ ও বামন মটরশুঁটি গাছের প্রজননে ১ম অপত্য বংশে সকল গাছই লম্বা হয়। এক্ষেত্রে লম্বা বৈশিষ্ট্যকে প্রকট ও বামন বৈশিষ্ট্যকে প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য বলে।

প্রকট-প্রচ্ছন্ন জিনগুলাে হােমােলােগাস ক্রোমােসােমের একই লােকাসে অবস্থান করে।

এক সঙ্কর (Monohybrid) ও দ্বিসঙ্কর (Dihybrid) ক্রস

যখন কোন ক্রসে মাত্র একজোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জিন বিবেচনা করা হয় তাকে এক সঙ্কর ক্রস বলে। যেমন- বিশুদ্ধ লম্বা মটরশুটি ও বামন মটরশুটি গাছের মধ্যে সংকরায়ন।

অপরদিকে, যখন কোনাে ক্রসে দুই জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জিন থাকে তখন তাকে দ্বিসঙ্কর ক্রস বলা হয়।

উদাহরণ- মটরশুটিতে গােল-হলুদ বীজ সম্পন্ন গাছ ও কুঞ্চিত-সবুজ বীজ সম্পন্ন গাছের মধ্যে সংকরায়ন।

মেন্ডেলের বংশগতির প্রথম সূত্র

‘জীবের প্রতিটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি একক দায়ী থাকে যাকে ফ্যাক্টর (জিন) বলা হয় এবং ফ্যাক্টর বা জিনগুলাে জোড়ায় জোড়ায় থাকে। সঙ্কর (hybrid) জীবে ফ্যাক্টর বা জিনগুলাে মিশ্রিত না হয়ে পাশাপাশি অবস্থান করে এবং গ্যামিট উৎপাদনের সময় অপরিবর্তিত অবস্থায় পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে ভিন্ন ভিন্ন গ্যামিটে গমন করে। একে পৃথকীকরণ সূত্র বা মনােহাইব্রিড ক্রসের সূত্রও বলে।

ব্যাখ্যা

একটি বিশুদ্ধ কালাে গিনিপিগের সাথে একটি বিশুদ্ধ সাদা গিনিপিগের ক্রস করলে সন্তান-সন্ততি কালাে হয়। আবার F1 সন্তান-সন্ততির মধ্যে ক্রস করলে ৩/৪ ভাগ কালাে গিনিপিগ এবং ১/৪ ভাগ সাদা গিনিপিগের জন্ম হয়। মনেকরি,গিনিপিগের কালাে রঙের জন্য B জিন দায়ী। অতএব, একটি বিশুদ্ধ বা হােমােজাইগাস কালাে গিনিপিগের জিনােটাইপ BB (কারণ, দেহকোষে কমপক্ষে দুটি ক্রোমােসােম থাকে)।

অনুরূপভাবে গিনিপিগের সাদা রঙের জন্য b জিন দায়ী। অতএব, বিশুদ্ধ সাদা গিনিপিগের জিনােটাইপ bb। হােমােজাইগাস কালাে (BB) এবং বিশুদ্ধ হােমােজাইগাস সাদা (bb) পিতা-মাতা (P) প্রজননের পূর্বে গ্যামিট তৈরি করবে। ফলে কালাে গিনিপিগের স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের গ্যামিটে B জিন এবং সাদা গিনিপিগের স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষ সকল গ্যামিটে b জিন থাকবে।

এখন উপরিউক্ত কালাে ও সাদা গিনিপিগের ক্রসে B এবং b জিন সম্পন্ন পুং ও স্ত্রী গ্যামিটের মিলনে জিনােটাইপ সম্পন্ন F1 বংশের জন্ম হবে] F1 বংশধরদের মধ্যে B এবং b উভয় অ্যালিল উপস্থিত থাকার কারণে এদের ফিনােটাইপ হবে হেটারােজাইগাস কালাে। এখানে কালাে রঙের জিন B প্রকট এবং সাদা রঙের জিন b প্রচ্ছন্ন। এ জিনদ্বয় হােমােলােগাস ক্রোমােসামের একই লােকাসে অবস্থান করবে।

F1 বংশের হেটারােজাইগাস কালাে গিনিপিগ (Bb) পুনরায় প্রজননের জন্য গ্যামিট সৃষ্টি করবে এবং পুরুষ-স্ত্রী প্রত্যেক দুই প্রকার গ্যামিট তৈরি করবে। গ্যামিটের অর্ধেকে থাকবে B জিন এবং বাকি অর্ধেকে থাকবে b জিন। কারণ সঙ্কর (hybrid)গিনিপিগের B ও b জিন ভিন্ন ভিন্ন ক্রোমােসােমে অবস্থান করে এবং একই কোষে অবস্থান কালে মিশ্রিত হয় না বা বিনষ্ট হয় না। এখন B জিন বহনকারী পুং গ্যামিট B বা b জিন বহনকারী গ্যামিটকে নিষিক্ত করতে পারে।

অনুরূপভাবে b জিন বহনকারী পুং গ্যামিট B বা b জিন বহনকারী স্ত্রী গ্যামিটকে নিষিক্ত করতে পারে। ফলে F2 বংশ 1BB : 2 Bb : 1bb জিনােটাইপিক অনুপাতে যথাক্রমে হােমােজাইগাস কালাে,হেটারােজাইগাস কালাে এবং হােমােজাইগাস সাদা গিনিপিগ জন্মলাভ করে। এদের ফিনােটাইপিক অনুপাত হয় ৩ কালােঃ১ সাদা।

জিনতাত্বিক ব্যাখ্যা

মেন্ডেল এর বংশগতির দ্বিতীয়সূত্র

‘দুই বা ততােধিক জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবে সঙ্করায়ন ঘটালে গ্যামিট সৃষ্টিকালে প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের ফ্যাক্টর বা জিন যুগলের স্বাধীন সঞ্চারণ বা বিন্যাস ঘটে এবং কোন একটি ফ্যাক্টর যুগলের সঞ্চারণ অন্য ফ্যাক্টর যুগলের উপর নির্ভরশীল নয়’। একে স্বাধীন সঞ্চারণ বা ডাইহাইব্রিড ক্রস সূত্রও বলে।

ব্যাখ্যা

মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্র ব্যাখ্যার জন্য একটি ডাইহাইব্রিড ক্রস বর্ণনা করা হলাে। দুই জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবের মধ্যে প্রজননকে ডাইহাইব্রিড ক্রস বলা হয়। গিনিপিগের কালাে গাত্রবর্ণ সাদা গাত্রবর্ণের উপর প্রকট এবং অমসৃণ লােমের অবস্থা মসৃণের উপর প্রকট।

বিশুদ্ধ কালাে-অমসৃণ (black-rough) গিনিপিগের সাথে বিশুদ্ধ সাদা-মসৃণ (white-smooth) গিনিপিগের ক্রস করলে F1 বংশের কালাে-অমসৃণ পুরুষ ও স্ত্রী গিনিপিগের মধ্যে ক্রস করলে F2 বংশে নিম্নলিখিত অনুপাতে গিনিপিগ জন্মলাভ করে। কালাে-অমসৃণঃ কালাে-মসৃণ ও সাদা-অমসৃণ ও সাদা-মসৃণ = ৯ঃ৩ঃ৩ঃ১। গিনিপিগের কালাে গাত্র বৈশিষ্ট্যের জন্য জিন প্রতীক B এবং অমসৃণ বৈশিষ্ট্যের জন্য জিন প্রতীক R কল্পনা করলে একটি বিশুদ্ধ কালাে-অমসৃণ গিনিপিগের জিনােটাইপ হবে BBRR। কারণ প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জন্য একজোড়া জিন বর্তমান।

অনুরূপভাবে সাদা গাত্রবর্ণ বৈশিষ্ট্যের জন্য জিন একক b এবং মসৃণ লােম বৈশিষ্ট্যের জন্য জিন একক r কল্পনা করলে একটি বিশুদ্ধ সাদা-মসৃণ গিনিপিগের জিনােটাইপ হবে bbr /BBRR এবং bbrr পিতা-মাতা গিনিপিগদ্বয় প্রজননের পূর্বে গ্যামিট উৎপাদন করবে এবং প্রত্যেক গ্যামিটে যথাক্রমে BR এবং br জিন থাকবে। ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনে F1 বংশে উৎপন্ন সকল গিনিপিগের জিনােটাইপ হবে BbRr কিন্তু ফিনােটাইপ হবে কালাে-অমসৃণ। এখানে B এবং R জিনের উপস্থিতিতে যথাক্রমে b এবং r জিন প্রচ্ছন্ন থাকে।

F1 বংশের হেটারােজাইগাস কালাে-অমসৃণ (BbRr) গিনিপিগ পুনরায় প্রজননের পূর্বে মায়ােসিসের মাধ্যমে গ্যামিট সৃষ্টি করবে এবং স্ত্রী-পুরুষ প্রত্যেক প্রায় সমান সংখ্যায় চার প্রকার, যথা- BR, Br, bR, br গ্যামিট উৎপন্ন করবে।

এখানে, F1 বংশের দুটি গিনিপিগের মধ্যে ক্রস করলে এদের যেকোনাে এক প্রকার পুংগ্যামিট চার প্রকারের স্ত্রী গ্যামিটের যেকোনাে এক প্রকারের সাথে মিলিত হতে পারে। ফলে F2 বংশে ১৬ প্রকারের নিষেকের সম্ভাবনা থাকে।

জিনতাত্বিক ব্যাখ্যা

Leave a Comment