হৃদরােগঃবুকে ব্যথা,হার্ট অ্যাটাক,হার্ট ফেইলিউর

হৃদরােগ

মানবদেহের শারীরতত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে হৃদপিণ্ড। এটি মাংসল, ফাঁপা ও মোঁচার ন্যায় অঙ্গ। হৃদপিণ্ড ও রক্তবাহিকাগুলাে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হলে একাধিক ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। এগুলােকে একত্রে হৃদরােগ বলা হয়। যেমন- উচ্চ রক্ত চাপ, ধমনির কাঠিন্যতা, বুকে ব্যথা, হার্ট অ্যাটাক এবং হার্ট ফেইলিউর ইত্যাদি।

বুকে ব্যথা

বুকে ব্যথা সাধারণত: হৃদপিণ্ডে স্বাভাবিক রক্ত চলাচলে কোন প্রকার বিঘ্ন ঘটলে সৃষ্টি হয়। স্বাভাবিক রক্ত চলাচলে বিঘ্নিত হওয়ার ফলে হৃদপিণ্ডের পেশিতে রক্ত সরবরাহ কমে গেলে, অথবা হার্ট ফেইলিউরের জন্য, বুকে মারাত্মক ব্যথা সৃষ্টি হয়।

চিকিৎসা ব্যবস্থা

সাধারণত নানা কারণে বুকের ব্যথা সৃষ্টি হয় বলে একে পৃথকভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়। ফলে ব্যথার ধরণ এবং স্থান বিবেচনায় এনে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রয়ােজন হয়। ব্যাথার কারণ নির্ণয় করতে হয় এবং অনেক সময় রক্ত পরীক্ষা, X-ray, সিটি স্ক্যান ও বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়।

হার্ট অ্যাটাক (Heart attack)

হৃদপেশিতে আঘাত লেগে বুকে ব্যথা ও চাপ সৃষ্টি হয়ে ২০-৪০ মিনিটের মধ্যে স্বাভাবিক রক্ত প্রবাহ ফিরে না আসলে হৃদপেশির মৃত্যু ঘটতে থাকে এবং এরূপ ৬-৮ ঘণ্টা ধরে পেশি মারা যেতে থাকলে তবে হার্ট অ্যাটাক ঘটে থাকে। হৃদপেশির আঘাতজনিত কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়।

যখন হৃদপেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হয় তখন তা আর সঠিকভাবে সংকোচন ঘটাতে পারে না এবং হৃদপিণ্ডের স্পন্দন থেমে যায় ও ফলে মস্তিষ্ক বিনষ্ট হয় এবং দেহের বিভিন্ন অঞ্চলে রক্ত প্রেরণে অক্ষম হয়। এক্ষেত্রে পাঁচ মিনিটের মধ্যে স্পন্দন শুরু না হলে মস্তিষ্ক বিনষ্ট ও রােগীর মৃত্যু ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভেন্ট্রিকুলার ফ্রাইব্রিলেশনজনিত হার্ট অ্যাটাক থেকে রােগীর মৃত্যু ঘটে।

ভেন্ট্রিকুলার ফ্রাইব্রিলেশন শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে যদি কার্ডিওপালমােনারি সঞ্চালন করা সম্ভব হয় তবে রােগী মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা পেতে পারে।

এছাড়া হার্ট অ্যাটাকের জন্য দায়ী ঝুঁকিপূর্ণ কারণগুলাে হলাে-

ভেন্ট্রিকুলার ফ্রাইব্রিলেশন

হৃদপেশির আঘাতজনিত কারণে হৃদপিণ্ডের স্পন্দন থেমে যায় এমনকি মস্তিষ্ক ও দেহের অন্যান্য অঞ্চলে রক্ত সঞ্চালন অক্ষম হয়ে পড়ে।এমতাবস্থায় ৫ মিনিটের মধ্যে রােগীর মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

রক্তে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি

অতিমাত্রায় কোলেস্টেরল বৃদ্ধির ফলে ধমনির ভেতরের প্রাচীরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়ে স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

উচ্চ রক্ত চাপ (Hyper blood pressure/hypertension)

অতিমাত্রায় উচ্চ রক্ত চাপের কারণে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ রােগীর মৃত্যু হতে পারে।
তামাক সেবন: তামাক ও তামাক জাতীয় রাসায়নিক উপাদান রক্ত নালির প্রাচীরকে আক্রান্ত করে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে তােলে। হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা তাৎক্ষণিক ডাক্তারের শরণাপন্য হওয়া ও অক্সিজেন সরবরাহ করা। রক্ত জমাট বাঁধানাে প্রতিহত করার জন্য অ্যাসপিরিন দেয়া। করােনারি ধমনির মধ্যে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি করার জন্য নাইট্রোগ্লিসারিন দেওয়া। বুকের ব্যথার চিকিৎসা আরম্ভ করা। নিয়মিত খাবার গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করা।

হার্ট ফেইলিউর (Heart failure)

হৃদপিণ্ড দেহের প্রয়ােজনীয় রক্ত প্রবাহ না করতে পারলে তাকে হার্ট ফেইলিউর বলে। উপসর্গ হিসেবে শ্বাস প্রশ্বাসের বাঁধা,ক্লান্তি, অবসাদ, পদতলে স্ফীতি, দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন ও বুকে ব্যথা অনুভূত হয়।

হার্ট ফেইলিউরের কারণ

হৃদপেশীতে সর্বদা রক্ত সরবরাহকারী ধমনিগুলাের মধ্যে চর্বি জমা হলে রক্তের প্রবাহ মাত্রা কমে যায়, হৃদপিণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ায় অক্সিজেন রক্ত সেখানে পৌঁছাতে পারে না। অনেক সময় ধমনি বিদীর্ণ হয়ে হার্ট ফেইলিউর ঘটে।

উচ্চ রক্ত চাপঃ ধমনির প্রাচীর ও হৃদপেশি দুর্বল হয়ে হার্ট ফেইলিউর ঘটায়।

ক্রটিপূর্ণ হৃদপিন্ডের কপাটিকাঃ হৃদপিণ্ডের কপাটিকা বিনষ্ট হলে রক্ত প্রবাহ, অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে হৃদপিণ্ডকে দুর্বল করে ফলে হার্ট ফেইলিউর ঘটে।

অস্বাভাবিক ছন্দময়তাঃহৃদপিণ্ডের অস্বাভাবিক ছন্দময়তা হৃদপিণ্ড দুর্বল করে হার্ট ফেইলিউর ঘটায়।

প্রতিরােধ ব্যবস্থাঃনিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক বিষন্নতা পরিহার, দেহের ওজন কমানাে, পরিমিত খাবার গ্রহণ, খাদ্যে লবণ পরিহার উচ্চ রক্ত চাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস ও হৃদরােগ সম্পর্কে সচেতন।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবন প্রয়ােজনে সার্জিকেল ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
যেমন-
(i) করােনারি বাইপাস সার্জারি
(ii) হৃদপিণ্ডের কপাটিকার মেরামত বা রিং বসানাে
(iii) ভেন্ট্রিকুলার পেশিং/পেস মেকার বসানাে।

Leave a Comment