একাদশ অধ্যায়ঃজিনতত্ত্ব ও বিবর্তন(GENETICS AND EVOLUTION)

জিনতত্ত্ব ও বিবর্তন(GENETICS AND EVOLUTION)

বংশগতি

মাতা-পিতার বৈশিষ্ট্য পরবর্তী বংশধরে সঞ্চারিত হওয়ার মাধ্যমে জীব তার নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখে একেই বংশগতি (Heredity) বলে।

জিনতত্ত্ব

বিজ্ঞানের যে শাখায় জিনের গঠন, কার্যপদ্ধতি, বংশানুক্রমিক সঞ্চালন পদ্ধতি এবং ফলাফল নিয়ে আলােচনা ও পর্যালােচনা করা হয় তাই জিনতত্ত্ব (Genetics)।

জিন

জিন হলাে DNA অণুর খণ্ডাংশ এবং বংশগতির মৌলিক একক যা বংশ পরম্পরায় সঞ্চারিত হয়ে জীবের সকল বৈশিষ্ট্য ধারণ ও বহন করে।

বিবর্তন

প্রকৃতিতে যে মন্থর ও ধারাবাহিক পরিবর্তনের মাধ্যমে অতীতে উদ্ভূত কোনাে সরল জীব হতে জটিল ও উন্নত জীবের আবির্ভাব ঘটে তাকে বিবর্তন(Evolution) বলে।

মেন্ডেলিজম ও মেন্ডেলিয়ান বংশগতি (Mendelian Inheritance)

মেন্ডেল কে ছিলেন?

গ্রেগর ইয়ােহান মেন্ডেলই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি বংশগতির নীতিসমূহ উদ্ভাবনে সমর্থ হন। মেন্ডেল ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে ২ রা জুলাই তৎকালীন অস্ট্রোহাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত সাইলেসিয়া (Silesia) অঞ্চলের হাইসেনডর্ফ (Heinzendorf- বর্তমানে চেক প্রজাতন্ত্রের অংশ) গ্রামের এক গরীব কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জার্মান ও চেক শি বংশােদ্ভুত পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান।

১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। অতঃপর মেন্ডেল প্রধানত আর্থিক কারণে ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার মােরাভিয়া অঞ্চলে ব্রন (Brun- বর্তমানে ব্রুনাে=brno; চেক প্রজাতন্ত্র) নামক স্থানের অগাস্টিনিয়ান মঠে শিক্ষানবীশ হিসেব যােগদান করেন। চার বৎসর পর তিনি যাজক হন। ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে মে (Znaim) প্রিপারেটরী স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অতঃপর ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৮৫৩ পর্যন্ত পড়াশুনা করে ব্রনে ফিরে আসেন। ব্রনে মডার্ন স্কুলে ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যােগ দেন এবং ১২ বৎসর একজন সার্থক শিক্ষক হিসেবে সুনামের সাথে কর্মরত ছিলেন।

স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় মঠের বাগানে অবসর সময়ে ৩৪ প্রকার মটরশুটি (Pisum sativum) উদ্ভিদ নিয়ে ১৮৫৭ থেকে গবেষণা শুরু করেন।দীর্ঘ সাত বৎসর গবেষণা করেন।১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারী ও মার্চে সঙ্করায়ন ও বংশগতি সম্বন্ধে তাঁর গবেষণার বিবরণ ও ফলাফল ব্রুন ন্যাচারাল হিস্টরী সােসাইটির পরপর দুটি বৈজ্ঞানিক সভায় উপস্থাপন করেন। সােসাইটির বার্ষিক মুখপত্রেও গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হয়।

অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় তৎকালীন বিশ্বে কেউই ধর্মযাজক মেন্ডেল এর গবেষণা ফলাফলের গুরুত্ব উপলব্ধি করেননি। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে মেন্ডেল মঠাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন এবং ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে ৬ই জানুয়ারী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জীবদ্দশায় তাঁর গবেষণা কর্মের জন্য তিনি কোন স্বীকৃতি লাভ করেননি।

মেন্ডেলের গবেষণাপত্র প্রকাশের ৩৫ বৎসর পর বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই হল্যান্ডের দ্য ভিস (de Vries) , জার্মানির কার্ল করেন্স (Karl Correns) ও অস্ট্রিয়ার শেরমাক (Tscher Mak) পৃথক পৃথকভাবে গবেষণা করে মেন্ডেল এর ফলাফলকে সমর্থন করেন। বর্তমানে বিশ্বে মেন্ডেল এর আবিষ্কার একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মেন্ডেলের সূত্র

মেন্ডেল কর্তৃক বর্ণিত সুত্রগুলাে জেনেটিক্সে মেন্ডেল এর সূত্র (Mendel’s Law) নামে অভিহিত।

মেন্ডেলতত্ত্ব (Mendelism) বা পার্টিকুলেট থিওরী ((particulate theory):

মেন্ডেল এর সূত্র অনুযায়ী জীবের বৈশিষ্ট্যসমূহ বংশগতিতে সঞ্চারণের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয় তাকেই মেন্ডেলতত্ত্ব (Mendelism) বা পার্টিকুলেট থিওরী ((particulate theory) বলে। মেন্ডেলতত্ত্ব আধুনিক জেনেটিক্স এর প্রধান ভিত্তি। একারণেই মেন্ডেলকে জেনেটিক্স এর জনক বলা হয়ে থাকে।

পার্টিকুলেট থিওরী ((particulate theory) বা মেন্ডেলতত্ত্ব (Mendelism) অনুযায়ী জীবে বংশগতির একক বিদ্যমান থাকে বা মিশ্রিত হয়না, শুধুমাত্র সুপ্ত থাকে। মেন্ডেলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মটরশুঁটি উদ্ভিদে প্রতিটি চরিত্রের (trait) জন্য (কাণ্ডের দৈর্ঘ্য, ফুলের অবস্থান, রং, ফলের বর্ণ, ফলের আকৃতি, বীজের বর্ণ এবং বীজের আকৃতি) এক জোড়া ফ্যাক্টর থাকে, যার একটি আসে পিতা থেকে এবং অপর একটি আসে মাতা থেকে। গ্যামিটে শুধু একটি একক উপস্থিত থাকে এবং পরবর্তী জনুতে সঞ্চারিত হয়।

মেন্ডেলিয়ান বৈশিষ্ট্য

মেন্ডেল বর্ণিত পার্টিকল বা ফ্যাক্টর বর্তমানে জিন নামে পরিচিত। আর একটি মাত্র জিন দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত বৈশিষ্ট্য মেন্ডেলিয়ান বৈশিষ্ট্য (Mendelian trait) বলে।

মেন্ডেলিয়ান বংশগতি(Mendelian inheritance)

মেন্ডেলিয়ান বৈশিষ্ট্যর সঞ্চায়ণকে মেন্ডেলিয়ান বংশগতি(Mendelian inheritance) বলা হয়।

মেন্ডেল মটরশুঁটি গাছ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন কেন?

সঙ্করায়ণ (Hybridization) পরীক্ষার জন্য মটরশুটি উদ্ভিদকে নির্বাচন করেন। মটরশুটি উদ্ভিদ উভলিঙ্গী,স্বপরাগায়নের মাধ্যমে যৌন প্রজনন সম্পন্ন হয়। পুংস্তবক ও স্ত্রীস্তবককে ঘিরে দলমণ্ডল (corolla) এমনভাবে সজ্জিত যে,পরনিষেকের (Cross fertilization) কোন সম্ভাবনা নেই।

ফলে বিভিন্ন জাতের (variety) মটরশুটি উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্যগুলাে খাটি বা বিশুদ্ধ অবস্থায় আছে। অত্যন্ত অল্প সময়ে এর জীবনচক্র সম্পন্ন হয় এবং স্বল্প শ্রম ও ব্যয়ে অধিক সংখ্যক অপত্য বংশ উৎপন্ন হয়। অপত্য বংশে কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের স্পষ্ট প্রকাশ পরীক্ষার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছিল।

মেন্ডেলের সফলতার কারণ

মেন্ডেল বিভিন্ন উৎস হতে ৩৪ ধরনের মটরশুটি উদ্ভিদের বীজ সংগ্রহ করে আশ্রমের বাগানে প্রায় এক বৎসর প্রত্যেক ধরনের বীজের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর পরীক্ষায় ব্যবহৃত সাতটি চরিত্রের (trait) জন্য (কাত্রে দৈর্ঘ্য, ফুলের অবস্থান, ফুলেররং, ফলের বর্ণ, ফলের আকৃতি, বীজের বর্ণ এবং বীজের আকৃতি) একজোড়া করে বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ১৪টি খাঁটি উদ্ভিদ নির্বাচন করেন।

প্রতি জোড়া বৈশিষ্ট্য পরস্পর বিপরীত ধর্মী। মটরশুটি উদ্ভিদের নির্বাচিত বৈশিষ্ট্যের প্রতিটি একটি মাত্র জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। বৈশিষ্ট্য নির্বাচনের বিষয়ে মেন্ডেল অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ছিলেন। কারণ জটিল বৈশিষ্ট্য নির্বাচন করলে মেন্ডেল বংশগতির অন্তর্নিহিত নীতিগুলাে হয়তােবা আবিষ্কার করতে পারতেন না। মেন্ডেল একটি যথাযথ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে সঙ্করায়ন পরীক্ষা পরিচালনা করেন।

অত্যন্ত সাবধানতার সাথে পরীক্ষণসমূহ নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তিনি যে পরাগরেণু স্থানান্তর করেছেন তার দ্বারাই পরাগায়ন হয়েছে তা নিশ্চিত করেন। সঙ্করায়নকালে মেন্ডেল অপত্য অংশে একসাথে মাত্র একটি চরিত্র পর্যবেক্ষণ করেন এবং সম্পূর্ণ উপাত্ত (data) সংরক্ষণ করেন।

অতঃপর পরিসংখ্যান (Statistics) এর প্রয়ােগ দ্বারা এ উপাত্ত থেকেই লব্ধ ফলাফলের যুক্তিযুক্ত বিশ্লেষণপূর্বক এবং একটানা প্রায় এক দশকের নিরলস পরিশ্রম দ্বারা বংশগতির নিয়ম সম্পর্কে পার্টিকুলেট থিওরী (Particulate theory)উপস্থাপন করেন।

Leave a Comment