উপাঙ্গীয় কঙ্কাল (Appendicular Skeleton)

মানুষের কঙ্কালতন্ত্রকে প্রধান দুটি অংশে ভাগ করা হয়। যথা-

(১) অক্ষীয় কঙ্কাল (Axial skeleton)

(২) উপাঙ্গীয় কঙ্কাল (Appendicular skeleton)

নিম্নে উপাঙ্গীয় কঙ্কালের বিস্তারিত বর্ননা দেওয়া হলো ।

মানুষের একজোড়া অগ্রপদ বা হাত, একজোড়া পশ্চাৎপদ বা পা, বক্ষ অস্থিচক্র (Pectoral girdle) ও শ্রোণিচক্র (Pelvic girdle) নিয়ে উপাঙ্গীয় কঙ্কালতন্ত্র গঠিত।

বক্ষ অস্থিচক্র (Pectoral girdle)

মানুষের দেহের দুই পাশে স্কন্ধ অঞ্চলে(কাধ) দুটি বক্ষ অস্থিচক্র অবস্থিত। এরা পরস্পর থেকে পৃথকভাবে অবস্থান করে। এদের একজোড়া ক্ল্যাভিকল ও একজোড়া স্ক্যাপুলা থাকে।

ক্ল্যাভিকল

 ক্ল্যাভিকল বাঁকা অস্থি। এ অস্থির কোন মজ্জাগহ্বর নেই।ক্ল্যাভিকল দেখতে ইটালিক ‘f” এর মতাে বাঁকা অস্থি। এটি একটি দেহ ও দুটি প্রান্ত, যথা স্টার্ণাল (স্টার্ণামের ম্যানুব্রিয়ামে যুক্ত থাকে) এবং অ্যাক্রোমিয়াল প্রসেস (স্ক্যাপুলায় যুক্ত অ্যাক্রোমিয়াল প্রসেস থাকে) নিয়ে গঠিত।

স্ক্যাপুলা

প্রতিটি স্ক্যাপুলা প্রশস্ত চ্যাপ্টা ত্রিকোণাকার অস্থি। এটি বক্ষ পিঞ্জরের উপরের প্রান্তের দু’পাশে অবস্থিত। এর পশ্চাৎ তলে আনুভূমিকভাবে একটি কাঁটা থাকে একে স্ক্যাপুলার কাঁটা বলে। স্ক্যাপুলার যে অংশে হিউমেরাসের মস্তক সংলগ্ন থাকে তাকে গ্লিনয়েড গহ্বর বলে। স্ক্যাপুলার পার্শ্বীয় প্রান্তের বর্ধিত অংশকে অ্যাক্রোমিয়াল প্রসেস বলে।

কাজঃ বাহুর পেশিকে সংযােগ দেয়া ও হিউমেরাসকে সঞ্চালন করা বক্ষ অস্থিচক্রের প্রধান কাজ।

অগ্রপদের অস্থিসমূহ (Bones of forelimb) ঃ প্রতিটি অগ্রপদের ৩০টি করে অস্থি থাকে।

১। হিউমেরাস (Humerus)

এটি অগ্রপদের সবচেয়ে বড় ও লম্বা অস্থি। হিউমেরাস এর ঊর্ধ্বপ্রান্তে রয়েছে মসৃণ, গােল মস্তক যা স্ক্যাপুলার গ্লেনয়েড গহ্বরে প্রবিষ্ট থাকে। তা ছাড়াও আছে ছােট ও বড় টিউবার্কল এবং এর মাঝখানে অ্যানাটমিক গ্রীবা (anatomic neck) নামে একটি খাঁজ।

টিউবার্কলের নিচে যে সরু অংশ থেকে হিউমেরাসের মূল দেহ গঠিত হয় তাকে সার্জিকাল গ্রীবা (surgical neck) বলে (কারণ, দুর্ঘটনায় এ অংশেই সচরাচর ফাটল ধরে)। মূল দেহের মধ্যভাগে পেশি সংযুক্তির জন্য খসখসে ডেলটয়েড ব্রিজ (deltoid ridge) রয়েছে। দেহের কিনারা নিম্নপ্রান্তে এসে এপিকন্ডাইল (epicondyle) গঠন করে। এপিকন্ডাইলের মাঝে কন্ডাইল (condyle) অবস্থিত যা উত্তল ক্যাপিচুলাম ও কপিকলের মতাে ট্রকলিয়া (trochlea) নিয়ে গঠিত। সংযােগী তল হিসেবে এ প্রান্তে করনয়েড ও ওলেক্রেনেন ফসা-ও থাকে।

২। রেডিয়াস ও আলনা (Radius & UIna)

হিউমেরাসের নিচের অস্থির নাম রেডিয়াস আলনা। আলনার উপরের প্রান্তে মােটা ও নিচের দিকে সরু। অপরপক্ষে রেডিয়াসের মাথার কাছে সরু এবং নিচের দিকে ক্রমশ মােটা। আলনার উপরের অংশে একটা সাপের ফনার মত গঠন থাকে। এটিকে ওলিক্রেনন প্রসেস বলে।

৩। কারপাল (Carpal) বা কার্পাস (Carpus) অস্থি

মানুষের কব্জিতে দুই সারিতে আটখানা কারপাল অস্থি থাকে।এসকল অস্থি কব্জি নাড়াতে সাহায্য করে।

৪। মেটাকার্পাল (Metacarpal)

করতল বা তালুতে পাঁচটি করে মেটাকারপাল অস্থি থাকে। মেটাকারপালের ৩টি অংশ থাকে। যথা- ১টি মস্তক, ১টি শ্যাফট ও ১টি বেস। মস্তক ও বেস কিছু মােটা কিন্তু শ্যাফট তুলনামুলক ভাবে সরু।

৫। ফ্যালানজেস (Phalanges)

আঙ্গুলের অস্থিগুলােকে ফ্যালানজেস বলে। বৃদ্ধাঙ্গুলে ২টি এবং বাঁকি ৪টি আঙ্গুলে ৩টি করে মােট ১৪টি ফ্যালানজেস থাকে।

শ্রোণিচক্র (Pelvic girdle)

মানুষের নিতম্ব বা শ্রোণি অঞ্চলে দুই পাশে অবস্থিত ১ জোড়া সমআকৃতির অস্থি নিয়ে শ্রোণিচক্র গঠিত। শ্রোণিচক্রের প্রতিটি অস্থিকে হিপ বােন বলে। প্রতিটি হিপ বােন বা অস্থি ইলিয়াম (illium), ইশ্চিয়াম (Ischium) ও পিউবিস (Pubis) এই তিনটি অস্থির সমন্বয়ে গঠিত।

ইলিয়াম, ইশ্চিয়াম ও পিউবিসের সংযােগ স্থলে অবস্থিত গহ্বরকে অ্যাসিটাবুলাম বলে। এই গহ্বরে ফিমারের মস্তক অবস্থান করে। ইশ্চিয়াম ও পিউবিসের সংযােগ স্থলে যে গহ্বরটি থাকে তাকে অবটুরেটর ফোরামেন বলে। দু’পাশের হিপবােন পিছনের দিকে স্যাক্রামের সাথে যুক্ত থাকে।সামনের দিকে পিউবিস অস্থিদ্বয় পরস্পর যুক্ত হয়ে পিউবিক সিমফাইসিস গঠন করে।

ইলিয়ামঃ ইলিয়ামটি দেহ ও ডানায় বিভক্ত। ডানার কিনারাকে ইলিয়াক ঝুঁটি বা ক্রেস্ট বলে। কিনারা দুটি উচু অংশে সমাপ্ত হয়েছে, এদের সম্মুখ সুপিরিয়র ও পশ্চাৎ সুপিরিয়র কাটা বলে। এদের নিচে থাকে সম্মুখ ইনফিরিয়র ও পশ্চাৎ ইনফিরিয়র কাটা। তা ছাড়াও ইলিয়ামে আকুয়েট রেখা, ইলিয়াক ফসা, গ্লুটিয়াল রেখা ও একটি অরিকুলার সংযােগী তল থাকে।

পিউবিসঃ পিউবিসটি দেহ ও দুটি শাখায় বিভক্ত। শাখা দুটিকে উর্ধ্ব ও নিম্ন র্যামি (একবচনে-র্যামাস) বলে। উর্ধ্ব র্যামাসে একটি পিউবিক অর্বুদ (টিউবারােসিটি) এবং একটি পিউবিক ঝুঁটি থাকে।

ইশ্চিয়ামঃ ইশ্চিয়ামটি দেহ,উর্ধ ও নিম্ন র্যামি,ইশ্চিয়াল অর্বুদ ও ইশ্চিয়াল কাঁটা নিয়ে গঠিত।কাঁটাটি বড় ইশ্চিয়াল খাঁজ কে ছোটটি থেকে পৃথক করেছে।

অবটুরেটর ফোরামেনঃ পিউবিক ও ইশ্চিয়াল র্যামি একটি ছিদ্রকে বেষ্টন করে রাখে। ছিদ্রটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে যোজক টিস্যুর ঝিল্লিতে আবৃত। এই ছিদ্র কে অবটুরেটর ফোরামেন বলে।

অ্যাসিটাবুলামঃ ইলিয়াম, ইশ্চিয়াম ও পিউবিসের সংযােগস্থলে অ্যাসিটাবুলাম (acetabulum) নামে একটি অগভীর অংশ রয়েছে। এতে ফিমারের মস্তক আটকানাে থাকে।

শ্রোণি-অস্থিচক্রের কাজ

বস্তিকোটর,মূত্রাশয়, অন্ত্রের নিম্নাংশ প্রভৃতি অঙ্গে অবলম্বন দান করা, ভার বহন করা এবং ভারসাম্য রক্ষা করা শ্রোণিচক্রের কাজ। ফিমারের মস্তক অ্যাসিটাবুলাম-এ যুক্ত থাকে। শ্রোণিচক্র পশ্চাৎপদের অস্থিসমূহ ধারণ কর।

পশ্চাৎপদ বা নিম্নবাহুর অস্থিসমূহ (Bones of hind limb)

প্রত্যেকটি পশ্চাৎপদ ৩০টি অস্থি নিয়ে গঠিত। এগুলাে নিম্নরূপ-

১। ফিমার (Femur)

ফিমার পশ্চাৎপদের প্রথম বড় অস্থি। ইহা দেহের সবচেয়ে লম্বা, ভারী ও শক্ত অস্থি। এর উধ্বপ্রান্তে একটি গােল মস্তক, গ্রীবা ও ছােট-বড় ট্রোকেন্টার অবস্থিত। নিম্নপ্রান্ত দুটি কন্ডাইল বিশিষ্ট। ফিমারের মস্তক শ্ৰোণিচক্রে অ্যাসিটাবুলামের সাথে যুক্ত থাকে। এর নিম্ন প্রান্তে প্যাটেলা (Patella) নামক চ্যাপ্টা সিসাময়েড অস্থি থাকে।

২। টিবিয়া-ফিবুলা (Tibia-fibula)

এটি পশ্চাৎপদের দ্বিতীয় অস্থি। এটি যুগ্ম ও দ্বিতীয় দীর্ঘতম অস্থি। এটি ভেতরের দিকে মােটা ও বৃহদাকার টিবিয়া এবং বাইরের দিকে পাতলা ও সরু ফিবুলা নামক অস্থি নিয়ে গঠিত।

টিবিয়াঃ টিবিয়া বেশি মােটা। এর ঊর্ধ্বপ্রান্ত দুটি কণ্ডাইল, একটি আন্তঃকইলার স্ফীতি, ফিমারের সাথে সংযুক্ত হওয়ার জন্য দুটি সংযোগী তল এবং পেশি সংযােজনের জন্য একটি টিউবারােসিটি বহন করে। টিবিয়ার দেহ ত্রিধারবিশিষ্ট। টিবিয়ার সম্মুখ কিনারা ঝুঁটি নামে পরিচিত। টিবিয়ার নিম্নপ্রান্তে ম্যালিওলাস নামে দুপাশে নিচু অংশ থাকে। এতে ট্যালাসের (টার্সাল অস্থি) সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য সংযােগী তলও রয়েছে।

ফিবুলাঃ ফিবুলা দেখতে একটি দীর্ঘ যষ্টির মতাে। এর মস্তক চোখা ধরনের। উর্ধ্বপ্রান্তে টিবিয়ার সংযােগের জন্য একটি সংযােগী তল থাকে। নিচের প্রান্তে থাকে ম্যালিওলাস।

৩। টারসাল (Tarsal) বা টার্সাস (Tarsus) অস্থি

পায়ের গােড়ালি গঠনকারী ৭টি অস্থিকে টার্সাস অস্থি বলে। টার্সাস অস্থিগুলাে হলাে- ট্যালাস ১টি, ক্যালকেনিয়াস ১টি, কিউবয়েড ১টি, নাভিকুলার ১টি ও কুনিফর্ম ৩টি।

৪। মেটাটার্সাস (Metatarsus bone)

পায়ের পাতায় ৫টি সরু ও লম্বাটে অস্থি থাকে। এদেরকে মেটাটারসাল বলে। এদের দুই মাথা মােটা এবং মধ্যভাগ সরু, নলাকার ও লম্বাটে।

৫। ফ্যালানজেস (Phalanges)

পায়ের আঙ্গুলে অবস্থিত ক্ষুদ্রাকৃতির অস্থিসমূহকে ফ্যালানজেস বলে। বৃদ্ধাঙ্গুলিতে ২টি ও অন্যান্য ৪টি আঙ্গুলে ৪টি করে মােট ১৪টি ফ্যালানজেস থাকে।

Leave a Comment