অষ্টম অধ্যায়ঃ মানব শারীরতত্ত্বঃ সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রন

সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ(Human Physiology : Coordination & Control)

উদ্দিপনা

উদ্দিপকের প্রভাবে প্রাণিদেহে যে সকল পরিবর্তন শনাক্ত হয় এবং উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তাদেরকে উদ্দীপনা (stimuli;একবচন stimulus) বলে।

উদ্দীপনা রিসেপ্টর (receptor) কর্তৃক গৃহিত হয়। এটি স্নায়ু বা নিউরন দ্বারা বাহিত হয় এবং ইফেক্টর (effectror) কর্তৃক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।

সমন্বয়

দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পারস্পরিক সহযােগিতামূলক কাজের মাধ্যমে দেহের সকল কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াকে সমন্বয় (Co-ordination) বলে।

অর্থাৎ জীব যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনায় সাড়া দিয়ে সকল কর্মকাণ্ডকে সুসংহতভাবে নির্বাহ করে তাকে সমন্বয় (Co-ordination) বলে।

সমন্বয়ের জন্য প্রাণীতে পৃথক কিন্তু সম্পর্কযুক্ত দুইটি তন্ত্র, যথা- স্নায়ুতন্ত্র এবং অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্র বিদ্যমান। স্নায়ুবিক সমন্বয় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে এবং রাসায়নিক সমন্বয় অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি তন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

স্নায়ুবিক সমন্বয় (Neural co-ordination)

 স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ, তন্ত্র, কলা ও কোষের মধ্যে যে সমন্বয় ঘটে তাকে স্নায়ুবিক বা নিউরাল সমন্বয় বলে।

এক্ষেত্রে স্নায়ুর মাধ্যমে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা এক কোষ থেকে অন্য কোষে পরিবাহিত হয়। এ বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা পরিশেষে স্নায়ুকোষের প্রান্তীয় নিউরােট্রান্সমিটার নিঃসরণের মাধ্যমে রাসায়নিক উদ্দীপনায় পরিণত হয়।

যেমন, একটি পেশি সংকোচনের জন্য মটর স্নায়ুর মাধ্যমে যে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা প্রেরিত হয় এটা পরিশেষে স্নায়ুপেশির সংযােগস্থলে (neuromuscular junction)অ্যাসিটাইল কোলিন রূপে মুক্ত হয়।

এ অ্যাসিটাইল কোলিন পেশি মেমব্রেনের উপর ক্রিয়া করে, ফলে পেশি সংকুচিত হয় ।

স্নায়ু তন্ত্রের গঠন (Organization of nervous system)

স্নায়ুতন্ত্র একটি সিঙ্গেল ইউনিফাইড কমুনিকেশন সিস্টেম হলেও অঙ্গ সংস্থানিক ভিত্তিতে একে সামগ্রিকভাবে সাধারণতঃ দু’ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে।যথা-

১।কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (Central nervous system বা CNS)

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র গঠিত হয় মস্তিষ্ক (brain) ও সুষুম্না কান্ড (spinal cord) নিয়ে।

২। প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (Peripheral nervous system বা PNS)

সংশ্লিষ্ট সুষুম্মা স্নায়ু বা স্পাইরাল স্নায়ু এবং গ্যাংগ্লিয়া নামক স্নায়ু কোষ বডি গুচ্ছ।

স্নায়ুতন্ত্রের গাঠনিক একক দুই ধরনের, যথা- নিউরন ও নিউরােগ্লিয়াল কোষ বা নিউরোগ্লিয়া।

নিউরন (Neuron)

একটি আদর্শ নিউরনকে প্রধানতঃ দুটি অংশে ভাগ করা যায়, যথা-

ক. কোষদেহ (Cell body/soma)

কোষ দেহে প্লাজমামেমব্রেন, সাইটোপ্লাজম, নিউক্লিয়াস বিভিন্ন অঙ্গাণু আছে। কোষ দেহ গােলাকার, তারকাকার বা ত্রিভুজাকার হতে পারে।

সাইটোপ্লাজমে মাইটোকন্ড্রিয়া, গলজিবস্তু, লাইসােসােম, চর্বি,গ্লাইকোজেন, রঞ্জক কণাসহ অসংখ্য নিসল দানা (Nissl’s granules) থাকে। নিসল দানা প্রকৃতপক্ষে রাইবােসােমের সমষ্টি। এ

রা নিউরাে ট্রান্সমিটার বস্তু তৈরি করে। কোষদেহ সুপ্রত্যক্ষ নিউক্লিয়ােলাস কেন্দ্রীয় একটি নিউক্লিয়াস ধারণ করে।

খ. প্রলম্বিত অংশ বা প্রবর্ধক (Processes)

 কোষদেহ থেকে সৃষ্ট শাখা প্রশাখাকেই প্রলম্বিত অংশ বলে। প্রলম্বিত অংশ দুই প্রকারের, যথা-

১। ডেনড্রন

বহু শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট ছােট ছােট প্রলম্বিত অংশগুলাের নাম ডেনড্রন। ডেনড্রনের শাখাগুলােকে ডেনড্রাইট বলে। ডেনড্রাইটের মাধ্যমে উদ্দীপনা দেহের দিকে সংগৃহীত হয়।

একটি স্নায়ু কোষে ডেনড্রাইটের সংখ্যা শূন্য থেকে অসংখ্য পর্যন্ত হতে পারে।

২। অ্যাক্সন (Axon)

প্রায় শাখা-প্রশাখাবিহীন দীর্ঘ প্রলম্বিত অংশের নাম অ্যাক্সন। অ্যাক্সন কোষ দেহ থেকে এক বা একাধিক মিটার বিস্তৃত হতে পারে।

যেমন সায়াটিক স্নায়ুতে থাকা নিউরন স্পাইনাল স্নায়ু থেকে পদতল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। খাটোতম অ্যাক্সন থাকে মস্তিস্কের নিউরনে যা মাত্র কয়েক মাইক্রোমিটার দীর্ঘ। অ্যাক্সনের মাধ্যমেই উদ্দীপনা কোষদেহ থেকে বাইরের পরবর্তী নিউরন,পেশিকোষ বা গ্রন্থিতে প্রবাহিত হয়।

অ্যাক্সন নিউরিলেমা দ্বারা আবৃত থাকে। নিউরিলেমার নিচে একটি বিচ্ছিন্ন ফ্যাটি পদার্থের স্তর থাকে একে মায়েলিন শীথ (Myelin sheath)বলে। রাবার শীথ যেমন বিদ্যুত্বাহী তারকে অন্তরীত করে ঠিক তেমনি মায়েলিন শীথ অ্যাক্সনকে পৃথক করে। যে স্থানগুলােতে মায়েলিন শীথ (Myelin sheath) অনুপস্থিতসেখানে সংকোচনের সৃষ্টি হয়।

এসব সংকোচনকে র্যানভিয়ারের পর্ব (Ranvier node) বলে। যেহেতু স্নায়ু উদ্দীপনা মায়েলিন শীথের মধ্য দিয়ে যেতে পারে না সেহেতু এরা এক পর্ব (Node) থেকে আরেক পর্বে লাফ দিয়ে স্নায়ু তাড়নার গতি বৃদ্ধি করে।

নিউরােগ্লিয়াল কোষ বা নিউরোগ্লিয়া (Neuroglia or Glia)

নিউরনকে পরিবেষ্টনকারী এক বিশেষ ধরণের কোষ স্নায়ুতন্ত্রে দেখা যায়। এদেরকে নিউরােগ্লিয়াল কোষ বলে। এরা প্রণােদনা পরিবহনে সক্ষম নয় শুধু নিউরনের আবরক, সহায়ক ও পুষ্টি দাতা হিসেবে কাজ করে।

সিন্যাপস (Synapse)

দুটি নিউরনের সংযােগস্থলকে অথবা একটি নিউরন ও একটি ইফেক্টরের (যেমন পেশি অথবা গ্রন্থি)সংযােগস্থলকে সিন্যাপস বলে।

সিন্যাপস এর মাধ্যমে উত্তেজনা বা তথ্য এক নিউরন থেকে অন্য নিউরনে প্রেরিত হয়। এগুলাের মাধ্যমেই প্রান্তীয় স্নায়ু দ্বারা গৃহীত উদ্দীপনা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রেরিত হয় এবং কেন্দ্রের নিদের্শাবলি প্রান্তের সুনির্দিষ্ট অঙ্গে পৌছায়।

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সকল উচ্চতর কার্যাবলি যেমন- সমন্বয়, শিক্ষণ, স্মৃতি ইত্যাদি সবকিছুই সম্ভব হয় কেবল সিন্যাপসের জন্য। স্নায়ুতন্ত্রে সিন্যাপস অসংখ্য এবং ধারণা করা হয় এর সংখ্যা প্রায় ১০১*১৪ ।

এসব সিন্যাপস বিভিন্ন ধরনের ও বিভিন্ন নামের হয়ে থাকে।

সিন্যাপসের গঠন

দুটি নিউরনের অংশ মিলিত হয়ে সিন্যাপস গঠন করে। যে নিউরনের অ্যাক্সন সিন্যাপস গঠনে অংশ নেয় তাকে প্রিসিন্যাপটিক নিউরন বলে। সিন্যাপস গঠনকারী অন্য নিউরনকে পােস্ট সিন্যাপটিক নিউরন বলে।

প্রিসিন্যাপটিক নিউরনের প্রিসিন্যাপটিক মেমব্রেন এবং পােস্টসিন্যাপটিক নিউরনের পােস্টসিন্যাপটিক মেমব্রেন সম্মিলিতভাবে সিন্যাপস গঠন করে।

এ দুটি মেমব্রেনের মাঝে প্রায় ২০ ন্যানােমিটার দৈর্ঘ্যের তরল পূর্ণ ফাঁক থাকে একে সিন্যাপটিক ক্লেফট (Synaptic cleft) বলে।

প্রিসিন্যাপটিক মেমব্রেন প্রকৃতপক্ষে প্রিসিন্যাপটিক নিউরনের অ্যাক্সনের স্ফীত প্রান্তের অংশ। অ্যাক্সনের স্ফীত প্রান্তকে সিন্যাপটিক নব (Synaptic knob) বলে।

এ নবের ভিতরে অসংখ্য মাইটোকন্ড্রিয়া,মাইক্রোফিলামেট এবং নিউরােট্রান্সমিটার যুক্ত ভেসিকল থাকে। আর পোস্টসিন্যাপটিক মেমব্রেন, পােস্টসিন্যাপটিক নিউরনের সােমা বা ডেনড্রাইট বা অ্যাক্সনের অংশ।

নিউরােট্রান্সমিটার

যে সব রাসায়নিক বস্তু স্নায়ুকোষ থেকে নিঃসৃত হয়ে স্নায়ু উদ্দীপনা এক নিউরন হতে অন্য নিউরন কিংবা পেশিকোষ অথবা কোন গ্রন্থিতে পরিবহনে সহায়তা করে তাদের নিউরােট্রান্সমিটার বলে।

সিন্যাপসের কাজ

এগুলাে এক নিউরন থেকে অন্য নিউরনের তথ্যের প্রেরণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এরা উদ্দীপনা বাছাই করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রেরণ করে। এরা নিউরােট্রান্সমিটার বস্তু ক্ষরণ করে।

এরা বিভিন্ন নিউরনের মধ্যে সমন্বয় ঘটায় এবং স্নায়ু উদ্দীপনার গতিপথ নির্ধারণ করে।

স্নায়ুতন্ত্রের স্নায়ুসমূহ অতি উদ্দীপিত হলে অবসাদ গ্রস্থ (fatigued) হতে বাধা দেয়া। খুব অল্প মাত্রার স্নায়ু উদ্দীপনাকে ফিল্টার করে বাদ দেয়া (যেমন ঘড়ির কাটার খুব সামান্য শব্দ শুনি না)।

সব উদ্দীপনার ক্রিয়াকে সমষ্টিবদ্ধ করে (summation) তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করা। স্মৃতি শক্তির ভৌত কাঠামাে হিসেবে কাজ করা ।

সংক্ষেপে স্নায়ুতন্ত্রের কাজ (functions of nervous system)

১। পরিবেশের যেকোন প্রভাবকে উপলব্ধি করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা । পরিবেশের সঙ্গে দেহের সমন্বয় রক্ষা এর প্রধান উদ্দেশ্য।

২। দেহের বিভিন্ন অঙ্গ সমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে এদের সুনিয়ন্ত্রিত করা। যেমন- চলন কালে চলন অঙ্গ সমূহের সঙ্গে মাথা, ঘাড়, চক্ষু, কর্ণ প্রভৃতি অঙ্গ একই সঙ্গে সমন্বিত হয়।

দেহের অ্যাসােসিয়েসন কেন্দ্র ও চেষ্টীয় অঞ্চল সমূহসমন্বিত কাজের মাধ্যমে দেহের যান্ত্রিক ও রাসায়নিক বিক্রিয়াকে সুনিয়ন্ত্রিত করে।

৩। ঐচ্ছিক অনৈচ্ছিক পেশির নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রন্থির ক্ষরণের ন্যায় চেষ্টীয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য বাইরের উদ্দীপনাকে গ্রহণ করা।

৪। স্নায়ুকোষ সমূহের উদ্দীপনাকে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পরিচালনা করে সংবেদী অঙ্গ সমূহ কার্যকর করে।

৫। বিভিন্ন তথ্যসমূহ সংরক্ষণের মাধ্যমে অতীত অভিজ্ঞতার আলােকে আচরণকে পরিবর্তিত করে ।

Leave a Comment